মেনু নির্বাচন করুন

মাদারীপুর ব্রান্ডিং লোগো

মাদারীপুর: ঐতিহ্য হারাচ্ছে এবং হারিয়ে যাচ্ছে মাদারীপুরের ঐতিহ্যবাহী খেজুরের গুড়।প্রচার-প্রচারণা না থাকলেও রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাদারীপুরের গুড়ের কদর এবং চাহিদা রয়েছে যথেষ্ঠ।পাটালি গুড় ভাঙলে কাচা রসের মদিরা গন্ধ এবং লাল-খয়েরী স্ফটিকের মতো রঙ আর অতুলনীয় স্বাদ,এই ছিল মাদারীপুরের পাটালি গুড়ের আদি আকর্ষণ।

সাহিত্যিক নরেন্দ্রনাথ মিত্রের জন্ম ফরিদপুরে (মাদারীপুর তখন ফরিদপুরের মহকুমা) ঠিকই কিন্তু তাঁর বিখ্যাত ‘রস’ গল্পে (যে গল্প নিয়েই পরবর্তীতে বলিউডে ‘সওদাগর’ ছবিটা করা হয়েছে) যে অঞ্চলের বর্ণনা পাওয়া যায় সেটা অবিভক্ত ভারতবর্ষের বৃহত্তর যশোর এবং বর্তমান ফরিদপুর জেলার কিয়দংশ। মনে হয় নরেন্দনাথ মিত্রের কখনো মাদারীপুর আসা হয়নি বা এ অঞ্চলের গুড়ের স্বাদ গ্রহণ করা হয়নি। তাহলে তিনি এখানকার বর্ণনাই দিতেন। নয় তো গুড় নামে ভিন্ন কোনো গল্প লিখতেন।
 

 

ভৌগলিক আয়তন, ব্যবসায়িক মনোভাব এবং প্রচারের কারণে প্রাচীনকাল থেকেই বৃহত্তর যশোর অঞ্চলের খেজুরের গুড়ের খ্যাতি ও যশ চারদিকে ছড়িয়েছে।সে তুলনায় মাদারীপুরে গুড়ের কিছুই হয়নি। অথচ মাদারীপুরের গুড়ের ধারে-কাছে নেই দেশের অন্য সব অঞ্চলের গুড়।মাত্র বিশ থেকে পঁচিশ বছর আগেও সমগ্র মাদারীপুর জেলার প্রায় সর্বত্রই মাঠে, ক্ষেতের আইলে, বড় রাস্তার ধারে, পুকুর পাড়ে, ঝোপ-ঝাড়ে, বাড়ির আঙিনায় খেজুর গাছ দেখা যেত ।বছর জুড়ে অবহেলা অযত্নে পড়ে থাকলেও শীতের শুরু অর্থাৎ পৌষের শুরু থেকে চৈত্রের শেষ পর্যন্ত চলত গাছের বিশেষ যত্ন, রস সংগ্রহ আর সেই রস জ্বাল দিয়ে বানানো হতো লোভনীয় গুড়।

সেই রামও নেই সেই অযোদ্ধাও নেই।কালেরর বিবর্তনে আজ সে ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। নির্বিচারে গাছকাটা, নতুন করে গাছ না লাগানো, তাছাড়া নতুন প্রজন্মের মধ্যে কষ্ট করার মানসিকতা না থাকায় এখন আর অোগের মতো সেই গুড় তৈরি হচ্ছে না।

খেজুরের গুড় আখের গুড়ের মতো মেশিনে বানানো সম্ভব নয়।এটা অতি যত্নের সথে সময় নিয়ে হাতে তৈরি করতে হয়। এটা একটা শিল্প, এটা সবাই পারে না। শুরুতেই নরেন্দ্রনাথ মিত্রের ‘রস’ গল্পের কথা বলেছি – ভালো মানের গুড় বানাতে মাজুবিবিদের মতো শিল্পী দরকার।‘ফুলবানু’দের গুড় মানদণ্ডে অনেক নিম্নমানের।কিন্তু বর্তমানে ‘ফুলবানু’দের গুড়েই বাজার সয়লাব।

এখন গুড় পরিষ্কার ও স্বচ্ছ করার জন্য সালফেট বা সালফাইড নামের এক ধরণের রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা হয় যা নির্দিষ্ট মাত্রার বেশি হলে মানবদেহের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।অথচ আগের দিনের কারিগরেরা কোনো প্রকার রাসায়নিক ছাড়াই স্বচ্ছ খয়েরী রঙের স্ফটিকের মতো পাটালি গুড় বা ঘন তরল দানাদার সানি গুড়(ঝোলা-গুড়) তৈরি করতেন।আর সে পাটালি গুড় ভেঙে মুখে দিলে মনে হতো যেন কেবল-ই গাছ থেকে নামিয়ে আনা কাঁচা রস খাওয়া হচ্ছে। গুড়ের টুকরোর দিকে তাকালে মনে হতো যেন রস বেড়িয়ে আসছে। হায়! কোথায় সেই অতুলনীয় স্বাদের গুড়, পিঠা-পুলি হতে শুরু করে খাবার পাতে দুধ-ভাত সাথে পাটালি’র টুকরা বা সানি গুড়, ভীর মিঠাই, সকালে মুড়ি-গুড়, চা-পিপাসুদের গুড়ের চা, মিষ্টির দোকানে গুড়ের সন্দেশ, গুড়ের ক্ষীরপুরি, ভোজ-উৎসবে গুড়ের ক্ষীর?

এখন চিনির দাম কম হওয়াতে রসের সাথে চিনি মিশিয়ে গুড় তৈরি করা হচ্ছে ।বাজারে যে গুড় এখন খুব ভালো বলে আমরা জানি তা বর্ণিত গুড়ের মানদণ্ডে তৃতীয় থেকে চতুর্থ স্থানীয়।দামও চড়া, স্থান ভেদে একশ পঞ্চাশ থেকে দুইশ পঞ্চাশ টাকা পর্যন্ত্, তাও চিনি এবং সালফাইড মিশানো।

এমনিতেই মাদারীপুর জেলাটি দেশের বাকি জেলাগুলোর তুলনায় বেশ কিছুটা অবহেলিত।পরাধীন আমল থেকে স্বাধীনতা পরবর্তি সময়ে হর্তা-কর্তা’রা কখনো কোনো স্থানীয় পণ্যের প্রসারে মনোযোগ দেননি। অথচ এই গুড়-শিল্প হতে পারত অন্যতম অর্থকরী কুটির শিল্প।এখনো চেষ্টা করলে ঐতিহ্য এবং শিল্পটি ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব।এ জন্য এর উৎপাদনের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের উৎসাহিত করতে হবে, উৎপাদিত পণ্যের সঠিক মান নির্ণয় ও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।বাজারমূল্য নির্ধারণ করে ঢাকাসহ দেশব্যাপী বিপননের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।বেকার ছেলে-মেয়েদের উৎসাহিত করতে হবে এ ব্যবসায় আসার জন্য। নয়তো ভবিষ্যতে আর ভালো কারিগর পাওয়া যাবে না।নির্বিচারে খেজুর গাছ না কেটে নতুন নতুন জায়গায় চারা রোপণ করতে হবে। বাণিজ্যিকভাবেও খেজুর বাগান করা যেতে পারে।নয়তো যে গুড় নিয়ে মাদারীপুরবাসী গর্ব করে ভবিষ্যতে যাদুঘরে গিয়েও সে ঐতিহ্যকে খুঁজে পাওয়া যাবে না।


Share with :

Facebook Twitter